
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শীর্ষ পর্যায়ে দীর্ঘদিনের শূন্যতায় সংস্থাটির কার্যক্রমে ভয়াবহ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত এবং অকাট্য তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্তে¡ও সাবেক সামরিক গোয়েন্দা প্রধান (ডিজিএফআই) লে. জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ ও তাঁর স্ত্রীসহ বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা সম্ভব হচ্ছে না। গত ৩ মার্চ কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি প্রশাসনিক ও আইনিভাবে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, শেখ মামুন খালেদ, তাঁর স্ত্রী নিগার সুলতানা খালেদ এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অনুসন্ধান এখন চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে। গত প্রায় এক বছর ধরে চলা এই অনুসন্ধানে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের কাছ থেকে বড় অংকের চাঁদাবাজি, জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং মানি লন্ডারিংয়ের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। কিন্তু কমিশনের অনুমোদন ছাড়া মামলা বা গ্রেপ্তারের আইনি এখতিয়ার না থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটি এখন অনিশ্চয়তায় ঝুলে আছে।
দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে সম্পদের পাহাড়
অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, মামুন খালেদ ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে নথিপত্রভিত্তিক বিশাল তথ্যভাÐার সংগৃহীত হয়েছে। গত বছরের ২২ মে থেকে এই দম্পতির ওপর আদালতের মাধ্যমে বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। তবে আইনি জটিলতায় তাঁদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, ‘ওয়ান-ইলেভেন’ আমলের আরেক আলোচিত ব্যক্তিত্ব লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা এবং আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও মামুন খালেদের ক্ষেত্রে দুদকের এই ‘প্রক্রিয়াগত অচলাবস্থা’ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুদকের মহাপরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান) মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী এই বিষয়ে নিশ্চিত করে বলেন, “অনুসন্ধানটি চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে কমিশনের অনুমোদন ছাড়া কোনোভাবেই মামলা দায়ের করা সম্ভব নয়।”
শেখ মামুন খালেদ ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ২০০৭-০৮ সালের তত্ত¡াবধায়ক সরকারের আমলে তিনি কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর পরিচালক ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর উপাচার্য এবং ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের (এনডিসি) কমান্ড্যান্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে আসীন হন।
তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ব্যবসায়ীদের ফোন কল বেআইনিভাবে রেকর্ড করা এবং সেই রেকর্ডিং ব্যবহার করে বø্যাকমেইল ও চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সাজানো ‘জঙ্গি নাটক’ মঞ্চস্থ করা এবং জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এর আগে একটি অভ্যন্তরীণ সামরিক তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবে তা কার্যকর হয়নি।
দেশত্যাগের চেষ্টা ও বর্তমান অবস্থা
২০২৪ সালের জুলাই পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মামুন খালেদ সপরিবারে দেশত্যাগের চেষ্টা করেছিলেন বলে জানা গেছে। তবে আগে থেকেই বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা থাকায় তিনি ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে গত ২৫ মার্চ মিরপুর ডিওএইচএস-এর বাসা থেকে একটি হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তিনি পাঁচ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, দুদকের মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখাতে পারলে অনেক তথ্য বেরিয়ে আসত, যা এখন কমিশনের অনুপস্থিতিতে সম্ভব হচ্ছে না।
দুদকের এই প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা কেবল মামুন খালেদের মামলা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে স্থবির করে দিয়েছে। দুদকের মহাপরিচালক আখতার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, কমিশন না থাকায় দুদক আইনের আওতায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে করে কার্যক্রমে এক ধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। আগের অনুমোদিত অনুসন্ধানগুলো সীমিত পরিসরে চললেও, নতুন করে মামলা করা বা চার্জশিট দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কমিশনের অবর্তমানে যে কাজগুলো থমকে আছে:- নতুন অনুসন্ধান অনুমোদন।, এজাহার বা নিয়মিত মামলা দায়ের। আদালতে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল। আসামিদের সম্পদ ক্রোক বা ফ্রিজ করা। বিদেশ গমনে আদালতের নিষেধাজ্ঞা চাওয়া।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই অচলাবস্থার সুযোগ নিয়ে অনেক হাই-প্রোফাইল আসামি আত্মগোপনে চলে যেতে পারেন বা দেশত্যাগের পথ খুঁজতে পারেন। এছাড়া দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল ও কাগুজে প্রমাণ নষ্ট হওয়ারও ঝুঁকি থাকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা জানান, “আমাদের হাতে অকাট্য প্রমাণ আছে, কিন্তু আইন আমাদের হাত বেঁধে রেখেছে। কমিশন না আসা পর্যন্ত আমরা কেবল ফাইল গুছিয়ে বসে থাকতে পারি।”
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দ্রæত কমিশন গঠন না হলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের যে গতি সঞ্চার হয়েছিল, তা পুরোপুরি হারিয়ে যাবে। সেই সঙ্গে জনমনেও দুদকের কার্যকারিতা নিয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।