
পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ শেষ হতে না হতেই সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে ‘আগুন’ লাগিয়ে দিয়েছে ভোজ্যতেলের বাজার। আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দেশের ভোজ্যতেল খাতের ৫-৬টি প্রভাবশালী কোম্পানি এক ভয়াবহ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা বাজারে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারে ৩৪ টাকা পর্যন্ত বেশি আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীদের এই ‘পকেট কাটার মহোৎসব’ এখন লাগামহীন।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মালিবাগ, বাড্ডা, নয়াবাজার ও জিনজিরাসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সরকার নির্ধারিত দামের কোনো প্রতিফলনই নেই বাজারে। গত বছরের ডিসেম্বরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মিলে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৭৬ টাকা এবং পাম তেলের দাম ১৬৬ টাকা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বর্তমানে রাজধানীর অধিকাংশ খুচরা বাজারে খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ১৯৫ থেকে ২১০ টাকা দরে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষকে লিটারপ্রতি ২০ থেকে ৩৪ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গুণতে হচ্ছে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে। তবে বাজারের বাস্তব চিত্র টিসিবির তথ্যের চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ। এক বছর আগের তুলনায় বর্তমানে সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় দেড় মাস ধরে বাজারে এক ও দুই লিটারের ছোট বোতলের সয়াবিন তেলের তীব্র সংকট তৈরি করা হয়েছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো যারা একবারে ৫ লিটারের বোতল কিনতে পারেন না, তারা বাধ্য হয়ে খোলা তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। আর এই সুযোগটিকেই কাজে লাগাচ্ছে সিন্ডিকেট।
মালিবাগ কাঁচাবাজারের মুদি ব্যবসায়ী মো. আল আমিন জানান, “আমরা কোম্পানিগুলোর কাছে ২০ কার্টন তেলের অর্ডার দিলে তারা দিচ্ছে মাত্র ২-৩ কার্টন। কোম্পানিগুলো ডিলারদের মাধ্যমে এমন কারসাজি করছে যাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল ঈদের আগেই দাম বাড়ানো, কিন্তু সরকারের কড়াকড়িতে তা পারেনি। এখন ঈদের সুযোগ নিয়ে তারা বাজার শূন্য করে ফেলেছে।”
আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি দেশে আমদানিও কম হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ভোজ্যতেল আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার টন কমেছে। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আমদানির এই ঘাটতি বর্তমানে বাজারে থাকা মজুতের তুলনায় খুব একটা বড় নয়। মূলত ৫-৬টি প্রভাবশালী কোম্পানি ডিলারদের মাধ্যমে সরবরাহ সীমিত করে এই সংকট তৈরি করেছে।
সচিবালয়ে সম্প্রতি এক বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির দাবি করেছিলেন, দেশে ১ লাখ ৭০ হাজার টন তেলের মজুত আছে এবং আরও ৩ লাখ ৬০ হাজার টন পাইপলাইনে রয়েছে। মন্ত্রীর এই আশ্বাসের পরও কেন বাজারে তেলের সংকট, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ ভোক্তারা।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা জাতীয় সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ভোজ্যতেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বাস্তবে কোনো ঘাটতি নেই। এটি একটি পরিকল্পিত কারসাজি। ব্যবসায়ীরা সরকারকে চাপে ফেলে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে। অতীতেও দেখা গেছে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে তার সুফল ভোক্তারা পায় না, কিন্তু বাড়লে মুহূর্তেই বাজারে দাম বেড়ে যায়। তিনি আরও যোগ করেন, অন্তর্র্বতী সরকারের সময় থেকে শুরু হওয়া এই বিশৃঙ্খলা বর্তমান সরকারের আমলেও থামেনি। বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর শৈথিল্যই সিন্ডিকেটকে সাহসী করে তুলছে।
ভোজ্যতেলের এই অস্থিরতার প্রভাবে অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। বাজারে এলপি গ্যাসের ১২ কেজি সিলিন্ডারে দাম বেড়েছে প্রায় ৪০০ টাকা। এছাড়া চাল, ডাল, মাছ ও মাংসের দামও ঊর্ধ্বমুখী। গ্রীষ্মকালীন সবজির বাজারও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বরবটি, বেগুন, করলা ও পটোলের কেজি বর্তমানে ৬০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। কাঁচামরিচের দাম ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি।
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী সাব্বির হোসেন ক্ষোভের সাথে বলেন, “আগে ছোট বোতলের তেল কিনতাম। এখন বাজারে ছোট বোতল নেই, ৫ লিটারের বোতলের দামও অনেক। খোলা তেল কিনতে গেলে বিক্রেতারা লিটারে ৩০-৪০ টাকা বেশি চাচ্ছে। আয় বাড়ছে না, কিন্তু খরচ বাড়ছে কয়েক গুণ। আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা বাজার তদারকি করছেন এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ভোক্তাদের মতে, খুচরা পর্যায়ে অভিযান চালিয়ে খুব একটা লাভ হবে না যতক্ষণ না বড় আমদানিকারক ও মিলগেট পর্যায়ে সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করা না হলে এবং সিন্ডিকেটভুক্ত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে ভোজ্যতেলের এই সংকট সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরনের অসন্তোষ তৈরি করতে পারে। সাধারণ মানুষের দাবি, সরকার যেন ব্যবসায়ীদের চাপে নতি স্বীকার না করে কঠোরভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।